ঢাকা ০৭:১৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের রূপকথা

শামার জোসেফের রূপকথা

স্পোর্টস ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০১:৪৩:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৪ ১২২ বার পড়া হয়েছে

ব্রিজবেনে চোট নিয়ে চোখধাঁধানো বোলিং পারফরম্যান্স দেখিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের শামার জোসেফ ভাসছেন স্তুতির জোয়ারে।

NEWS396 অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

টেস্ট অভিষেকে কীর্তি গড়া বোলিং, দ্বিতীয় ম্যাচে চোটের সঙ্গে লড়াই করে দলকে জেতানো পারফরম্যান্স; ক্যারিয়ার শুরু হতে না হতেই সুপারস্টার বনে গেলেন শামার জোসেফ। ব্রিজবেনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের এই পেসার যা করলেন তা অসাধারণ, দুর্দান্ত, চমৎকার এই শব্দগুলো দিয়ে ফুটিয়ে তোলা কঠিন। এসবের সঙ্গে তার টেস্ট ক্রিকেটার হয়ে ওঠার গল্প জুড়ে দিলে তো হার মানাবে রূপকথাকেও। সেটাই যেন বুঝাতে চাইলেন দক্ষিণ আফ্রিকান গ্রেট এবি ডি ভিলিয়ার্স ‘দা শামার জোসেফ ফেয়ারিটেল!’ লিখে।

গ্যাবায় রোমাঞ্চ-উত্তেজনায় ভরা দিবা-রাত্রির টেস্টটি রোববার ৮ রানে জিতে নেয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ২১ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট জয়ের স্বাদ পায় ক্যারিবিয়ানরা। আর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে জয় ধরা দেয় ২৭ বছর পর।

সব কিছুই সম্ভব হয়েছে শামার জোসেফের আত্মবিশ্বাস, দৃঢ় মনোবল ও সাহসিকতার কারণে। চোটের জন্য যার এদিন খেলার কথাই ছিল না, তিনিই কিনা গড়ে দিলেন ব্যবধান। প্রথম সেশনে টানা ১০ ওভারের এক স্পেলে ৬ উইকেট নিয়ে গুটিয়ে দিলেন অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং।

ম্যাচের শেষ উইকেটটি নিয়ে যে দৌড় দিলেন জোসেফ, তাকে ধরার সাধ্য ছিল না কারো। সেটা দেখে কে বলবে, তিনি পায়ের আঙুলের চোটে ভুগছেন। ব্যথানাশক ইনজেকশন দিয়ে খেলতে নেমেছেন।

শেষ পর্যন্ত জোসেফের বোলিং বিশ্লেষণ ছিল ১১.৫-০-৬৮-৭। ওয়েস্ট ইন্ডিজের চতুর্থ বোলার হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় ৭ উইকেট নেওয়ার কীর্তি গড়েন তিনি। ১৯৯৩ সালে সবশেষ ৭ উইকেট নিয়েছিলেন কার্টলি অ্যামব্রোস। এমন পারফরম্যান্সের পর জোসেফের স্তুতির জোয়ার ভাসাই স্বাভাবিক।

আগের দিন মিচেল স্টার্কের ইয়র্কার পায়ের অগ্রভাগে আঘাত করলে খুঁড়িয়ে মাঠ ছাড়েন জোসেফ। ব্যাটিং তো আর করতেই পারেননি, সেদিন আর মাঠেই নামেননি। রাতে যান হাসপাতালে, সেখানে করা হয় স্ক্যান।

পায়ে ছিল তীব্র ব্যথা, মনে হচ্ছিল না খেলা সম্ভব। তবে ব্যথানাশক ইনজেকশনের পর ব্যথা কমলে চতুর্থ দিন মাঠে নামেন জোসেফ। তিনি বল হাতে নেওয়ার আগে ম্যাচ ঝুঁকে ছিল অস্ট্রলিয়ার দিকেই। নিজের চোট, অস্ট্রেলিয়ার ভালো অবস্থান, গোলাপী বলে বোলিংয়ের অনভিজ্ঞতা- বিরূপ সব পরিস্থিতি উড়িয়ে দিয়ে তিনি যে চোখধাঁধানো বোলিং করলেন তা ছুঁয়ে গেছে ক্যারিবিয়ান সাবেক পেসার ইয়ান বিশপকে।

শামার জোসেফ।

 

“ডানপায়ে চোট নিয়ে অসাধারণ সাহসী ও শীর্ষ মানের বোলিং করার জন্য তরুণ শামার জোসেফকে ধন্যবাদ জানাই। তুমি যা অর্জন করেছ এবং ভবিষ্যতেও যা করে যাবে, সব কিছুর কৃতিত্ব তোমার এবং তোমার প্রিয়জনদের।”

গায়ানার নিভৃত এক গ্রাম, যেখানে যেতে হয় নদীপথে, পৌঁছাতে কখনও লেগে যায় দুই দিনও; সেই বারাকারায় জন্ম ও বেড়ে ওঠেন জোসেফ। লেবু, পেয়ারা দিয়ে বোলিং শেখা ছেলেটির টেস্ট ক্রিকেটে খেলাই ছিল বিস্ময়কর ব্যাপার। কিন্তু স্বপ্নের পিছু না ছেড়ে কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে জাতীয় দলে জায়গা করে নেওয়া ছেলেটি এখন ক্যারিবিয়ানদের চোখের মনি।

সামর্থ্যের ঝলক জোসেফ দেখান প্রথম ম্যাচেই। অ্যাডিলেইডে অভিষেকে প্রথম বলেই তুলে নেন সময়ের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন স্টিভেন স্মিথের উইকেট। এরপর আরও চার শিকার ধরে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম বোলার হিসেবে গড়েন অভিষেকে পাঁচ উইকেট নেওয়ার কীর্তি। ইতিহাসে তার নাম লেখা হয়ে গিয়েছিল তখনই।

এরপর ব্রিজবেনে তিনি যা দেখালেন, তা তো ব্যাখ্যাতীত। একটা সময় নৈশপ্রহরীর কাজ করা জোসেফের টেস্টের আঙিনায় এমন বিচরণ দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক ব্যাটসম্যান ডি ভিলিয়ার্সের কাছে অনুপ্রেরণার রসদ।

“(জোসেফকে নিয়ে জানতে চাইল) উইকিপিডিয়ায় গিয়ে তার জীবন সম্পর্কে পড়ুন। তার পথচলা নিয়ে পড়তে গিয়ে আমার চোখে পানি চলে এসেছিল। অন্তত বলতে হবে, অনুপ্রেরণাদায়ক।”

জীবনের বন্ধুর পথ পাড়ি দেওয়া জোসেফ ক্রিকেটের সবচেয়ে অভিজাত সংস্করণেও নিজের ছাপ রেখে চলেছেন। ভারতের সাবেক ব্যাটসম্যান ও কিংবদন্তি ক্রিকেটার সাচিন টেন্ডুলকারের মতে, অস্ট্রেলিয়া মাটিতে ক্যারিবিয়ানদের এই ঐতিহাসিক জয়ের স্থপতি ২৪ বছর বয়সী জোসেফ।

“শামার জোসেফের ৭ উইকেট নেওয়ার অসাধারণ স্পেলটি টেস্ট ক্রিকেটের নিখুঁত দৃঢ়তা এবং নাটকীয়তাকে তুলে ধরে। এটি এমন একটি সংস্করণ যা কোনো খেলোয়াড়ের সামর্থ্যকে চ্যালেঞ্জ করে। ২৭ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ঐতিহাসিক জয়ের মূল স্থপতি সে।”

জোসেফদের মতো ক্রিকেটাররা যেন হারিয়ে না যায়, সেদিকে স্থানীয় সরকার, বোর্ডকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশপ।

“শামার জোসেফ ও আরও দুয়েকজন ফাস্ট বোলারকে ক্যারিবিয়ানে রেখে, তারা কী পরিমাণ ক্রিকেট খেলবে সেটা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য অর্থ বরাদ্দের পথ খুঁজে বের করা বোর্ড, গায়ানা সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাদের গতিই সব। সেটা ফুরিয়ে যেতে দেবেন না।”

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের রূপকথা

শামার জোসেফের রূপকথা

আপডেট সময় : ০১:৪৩:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৪

টেস্ট অভিষেকে কীর্তি গড়া বোলিং, দ্বিতীয় ম্যাচে চোটের সঙ্গে লড়াই করে দলকে জেতানো পারফরম্যান্স; ক্যারিয়ার শুরু হতে না হতেই সুপারস্টার বনে গেলেন শামার জোসেফ। ব্রিজবেনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের এই পেসার যা করলেন তা অসাধারণ, দুর্দান্ত, চমৎকার এই শব্দগুলো দিয়ে ফুটিয়ে তোলা কঠিন। এসবের সঙ্গে তার টেস্ট ক্রিকেটার হয়ে ওঠার গল্প জুড়ে দিলে তো হার মানাবে রূপকথাকেও। সেটাই যেন বুঝাতে চাইলেন দক্ষিণ আফ্রিকান গ্রেট এবি ডি ভিলিয়ার্স ‘দা শামার জোসেফ ফেয়ারিটেল!’ লিখে।

গ্যাবায় রোমাঞ্চ-উত্তেজনায় ভরা দিবা-রাত্রির টেস্টটি রোববার ৮ রানে জিতে নেয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ২১ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট জয়ের স্বাদ পায় ক্যারিবিয়ানরা। আর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে জয় ধরা দেয় ২৭ বছর পর।

সব কিছুই সম্ভব হয়েছে শামার জোসেফের আত্মবিশ্বাস, দৃঢ় মনোবল ও সাহসিকতার কারণে। চোটের জন্য যার এদিন খেলার কথাই ছিল না, তিনিই কিনা গড়ে দিলেন ব্যবধান। প্রথম সেশনে টানা ১০ ওভারের এক স্পেলে ৬ উইকেট নিয়ে গুটিয়ে দিলেন অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং।

ম্যাচের শেষ উইকেটটি নিয়ে যে দৌড় দিলেন জোসেফ, তাকে ধরার সাধ্য ছিল না কারো। সেটা দেখে কে বলবে, তিনি পায়ের আঙুলের চোটে ভুগছেন। ব্যথানাশক ইনজেকশন দিয়ে খেলতে নেমেছেন।

শেষ পর্যন্ত জোসেফের বোলিং বিশ্লেষণ ছিল ১১.৫-০-৬৮-৭। ওয়েস্ট ইন্ডিজের চতুর্থ বোলার হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় ৭ উইকেট নেওয়ার কীর্তি গড়েন তিনি। ১৯৯৩ সালে সবশেষ ৭ উইকেট নিয়েছিলেন কার্টলি অ্যামব্রোস। এমন পারফরম্যান্সের পর জোসেফের স্তুতির জোয়ার ভাসাই স্বাভাবিক।

আগের দিন মিচেল স্টার্কের ইয়র্কার পায়ের অগ্রভাগে আঘাত করলে খুঁড়িয়ে মাঠ ছাড়েন জোসেফ। ব্যাটিং তো আর করতেই পারেননি, সেদিন আর মাঠেই নামেননি। রাতে যান হাসপাতালে, সেখানে করা হয় স্ক্যান।

পায়ে ছিল তীব্র ব্যথা, মনে হচ্ছিল না খেলা সম্ভব। তবে ব্যথানাশক ইনজেকশনের পর ব্যথা কমলে চতুর্থ দিন মাঠে নামেন জোসেফ। তিনি বল হাতে নেওয়ার আগে ম্যাচ ঝুঁকে ছিল অস্ট্রলিয়ার দিকেই। নিজের চোট, অস্ট্রেলিয়ার ভালো অবস্থান, গোলাপী বলে বোলিংয়ের অনভিজ্ঞতা- বিরূপ সব পরিস্থিতি উড়িয়ে দিয়ে তিনি যে চোখধাঁধানো বোলিং করলেন তা ছুঁয়ে গেছে ক্যারিবিয়ান সাবেক পেসার ইয়ান বিশপকে।

শামার জোসেফ।

 

“ডানপায়ে চোট নিয়ে অসাধারণ সাহসী ও শীর্ষ মানের বোলিং করার জন্য তরুণ শামার জোসেফকে ধন্যবাদ জানাই। তুমি যা অর্জন করেছ এবং ভবিষ্যতেও যা করে যাবে, সব কিছুর কৃতিত্ব তোমার এবং তোমার প্রিয়জনদের।”

গায়ানার নিভৃত এক গ্রাম, যেখানে যেতে হয় নদীপথে, পৌঁছাতে কখনও লেগে যায় দুই দিনও; সেই বারাকারায় জন্ম ও বেড়ে ওঠেন জোসেফ। লেবু, পেয়ারা দিয়ে বোলিং শেখা ছেলেটির টেস্ট ক্রিকেটে খেলাই ছিল বিস্ময়কর ব্যাপার। কিন্তু স্বপ্নের পিছু না ছেড়ে কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে জাতীয় দলে জায়গা করে নেওয়া ছেলেটি এখন ক্যারিবিয়ানদের চোখের মনি।

সামর্থ্যের ঝলক জোসেফ দেখান প্রথম ম্যাচেই। অ্যাডিলেইডে অভিষেকে প্রথম বলেই তুলে নেন সময়ের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন স্টিভেন স্মিথের উইকেট। এরপর আরও চার শিকার ধরে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম বোলার হিসেবে গড়েন অভিষেকে পাঁচ উইকেট নেওয়ার কীর্তি। ইতিহাসে তার নাম লেখা হয়ে গিয়েছিল তখনই।

এরপর ব্রিজবেনে তিনি যা দেখালেন, তা তো ব্যাখ্যাতীত। একটা সময় নৈশপ্রহরীর কাজ করা জোসেফের টেস্টের আঙিনায় এমন বিচরণ দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক ব্যাটসম্যান ডি ভিলিয়ার্সের কাছে অনুপ্রেরণার রসদ।

“(জোসেফকে নিয়ে জানতে চাইল) উইকিপিডিয়ায় গিয়ে তার জীবন সম্পর্কে পড়ুন। তার পথচলা নিয়ে পড়তে গিয়ে আমার চোখে পানি চলে এসেছিল। অন্তত বলতে হবে, অনুপ্রেরণাদায়ক।”

জীবনের বন্ধুর পথ পাড়ি দেওয়া জোসেফ ক্রিকেটের সবচেয়ে অভিজাত সংস্করণেও নিজের ছাপ রেখে চলেছেন। ভারতের সাবেক ব্যাটসম্যান ও কিংবদন্তি ক্রিকেটার সাচিন টেন্ডুলকারের মতে, অস্ট্রেলিয়া মাটিতে ক্যারিবিয়ানদের এই ঐতিহাসিক জয়ের স্থপতি ২৪ বছর বয়সী জোসেফ।

“শামার জোসেফের ৭ উইকেট নেওয়ার অসাধারণ স্পেলটি টেস্ট ক্রিকেটের নিখুঁত দৃঢ়তা এবং নাটকীয়তাকে তুলে ধরে। এটি এমন একটি সংস্করণ যা কোনো খেলোয়াড়ের সামর্থ্যকে চ্যালেঞ্জ করে। ২৭ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ঐতিহাসিক জয়ের মূল স্থপতি সে।”

জোসেফদের মতো ক্রিকেটাররা যেন হারিয়ে না যায়, সেদিকে স্থানীয় সরকার, বোর্ডকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশপ।

“শামার জোসেফ ও আরও দুয়েকজন ফাস্ট বোলারকে ক্যারিবিয়ানে রেখে, তারা কী পরিমাণ ক্রিকেট খেলবে সেটা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য অর্থ বরাদ্দের পথ খুঁজে বের করা বোর্ড, গায়ানা সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাদের গতিই সব। সেটা ফুরিয়ে যেতে দেবেন না।”